সেন্ট যোসেফস হাইস্কুল। ব্রিটিশ জামানা থেকে আজ পর্যন্ত এটি মেধাবী শিক্ষার্থীদের পীঠস্থান। ৮৬ বছর বয়সী এ প্রতিষ্ঠান ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণআন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা স্মৃতিচারণ করে আসছে। এখানকার শিক্ষার্থী প্রয়াত এ্যাড. মনোরঞ্জন দাস (পরবর্তীতে খুলনা জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী), মোহাম্মাদ মাজহারুল হান্নান (পরবর্তীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ) ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ মোঃ আইয়ুব খানের আমলে এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন দানা বাঁধে। বিশেষ করে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান নামক মামলা দায়েরের পর এখানকার শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠে।
৬৯’র স্মৃতিচারণ করে সেদিনের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জালাল উদ্দিন রুমী (এখন খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য) বলেন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে আসলেই সব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নামতো। এখানকার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখেন। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রাক্তন শিক্ষার্থী শেখ আব্দুস সালাম, স ম বাবর আলী, এ্যাড. মনোরঞ্জন দাস, ইস্কান্দার কবীর বাচ্চু, শেখ আব্দুল কাইয়ুম বলিষ্ঠ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা খুলনা জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়েও ভূমিকা রাখেন। পূর্ব পাকিস্তান জামানার সর্বশেষ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।
এ অভূতপূর্ব বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু করে। এক পর্যায়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ আগা ইয়াহিয়া খান একাত্তরের ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়, একাত্তরের ১ মার্চ। সকাল থেকে খুলনা শহরে ইথারে ইথারে খবর ভেসে আসে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট রেডিয়ো ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। দুপুর ১টা নাগাদ প্রেসিডেন্টের ভাষণের পরিবর্তে রেডিয়োতে জাতীয় সংসদের ৩ মার্চ এ অধিবেশন স্থাগিতের ঘোষণা প্রচারিত হয়। রেডিয়োতে এ ঘোষণার প্রতিবাদে খুলনা শহরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্র জনতা জঙ্গি মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। সোচ্চার করে ছাত্রজনতার স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ছয় দফা না এক দফা স্বাধীনতা স্বাধীনতা, বীর বাঙালি অস্ত্রধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে শহরে দেওয়াল লিখনের প্রয়োজন হয়। মার্চের প্রথমে গভীর রাতে দেওয়াল লিখনের নেতৃত্ব দেন জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শেখ আব্দুল কাইয়ুম।
৩ মার্চ স্বাধীনতার দাবিতে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল পার্ক (আজকের শহীদ হাদিস পার্ক) থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জঙ্গি মিছিল বের হয়। লোয়ার যশোর রোডস্থ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে বেলুচ পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। গুলিতে সাত জন শহীদ হয়। ৩ মার্চ বিকেলে ছাত্রসমাজ শহরের কালীবাড়ি রোড ও কে ডি ঘোষ রোডের কয়েকটি বন্দুকের দোকান লুট করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করে। এতে অন্যান্যের মধ্যে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শেখ আব্দুল কাইয়ুম, ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম ও মতিউর রহমান তরফদার অংশ নেন। ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের খুলনা কমিটি গঠিত হয়। ছাত্রলীগের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে এখানে আহ্বায়ক মনোনীত করা সম্ভব হয়নি। বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী স ম বাবর আলী ও হুমায়ুন কবীর বালুকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এ কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন শেখ আব্দুল কাইয়ুম (প্রাক্তন ছাত্র, সেন্ট যোসফস হাইস্কুল), ইস্কান্দার কবীর বাচ্চু (প্রাক্তন ছাত্র, সেন্ট যোসেফস হাইস্কুল), শেখ শহীদুল হক, হায়দার গাজী সালাউদ্দিন রুনু, হেকমত আলী ভুঁইয়া, শাহ আবুল কালাম, ফ ম সিরাজ, মাহবুবুল আলম হিরণ, শেখ শওকত আলী ও মিজানুর রহমান। ছাত্রলীগের ত্যাগী কর্মীদের নিয়ে জয় বাংলা বাহিনী গঠন করা হয়। জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র শেখ আব্দুল কাইয়ুম।
জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান, এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শেখ আব্দুল কাইয়ুম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন মরহুম শেখ আব্দুস সালাম, (জেলা মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার), স ম বাবর আলী (১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য), মরহুম ইস্কান্দার কবীর বাচ্চু, শেখ আব্দুল কাইয়ুম (জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান, খুলনা), মরহুম এ্যাড. শেখ আব্দুস সাত্তার, মরহুম খন্দকার সাজ্জাদ আলী, প্রয়াত এ্যাড. মনোরঞ্জন দাস, আশরাফুল আলম টুটু, এ্যাড. আ ব ম নূরুল আলম, তৌফিক উদ্দীন আহমেদ, (শ্রীউলা, সাতক্ষীরা), মেজর (অবঃ) শেখ জামসেদ হোসেন, এম এম ওয়াহিদুন্নবী, বাগমারার প্রয়াত তপন কুমার বিশ্বাস, হুমায়ুন কাদির খান দুলাল, প্রকৌশলী হারুণ অর রশিদ, ডঃ সরদার নুর নেওয়াজ, ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম, জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য মরহুম এ্যাড. ফিরোজ আহমেদ, মরহুম খন্দকার খায়রুল কবীর লনি, শেখ মাহতাব আলী, (কাচনা, মোল্লাহাট, বাগেরহাট), আব্দুল্লাহ হিল সাফী, মতিউর রহমান তরফদার, আতিয়ার রহমান তরফদার, মনোয়ার সানী ফরিদ ও বীরেন দাস বিরু (স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিম)।
স্মৃতি চারণের একপর্যায়ে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মতিউর রহমান তরফদার বলেন, খালিশপুরের চরেরহাট পাক বাহিনীর হাতে আমাদের সহপাঠী দোলখোলার অধিবাসী জাহাঙ্গীর হোসেন শহীদ হন।
খুলনা গেজেট/এনএম

